২০১৯ সালে চীনা টেলিকম জায়ান্ট হুয়াওয়ে ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কালো তালিকাভুক্ত করে মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় (ডিওসি)। এর আওতায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করে নেয়া হয় বিশেষ রফতানি নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম। ফলে আকস্মিকভাবেই প্রতিষ্ঠানগুলোর সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার সীমিত হয়ে পড়ে। বিপাকে পড়ে হুয়াওয়ে।
রাশিয়া ও বেলারুশে ভিডিও ক্যামেরা ও কম্পিউটার চার্জারের মতো পণ্যের রফতানি ঠেকাতে গত বছরেই স্থানীয় কোম্পানিগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।
সর্বশেষ ডোনাল্ড ট্রাম্পের রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে ফেলতে মূল্যবান খনিজ সম্পদ রফতানির ওপর নীতিগত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে চীন। এতে মার্কিন সেমিকন্ডাক্টর থেকে শুরু করে ইউরোপের গাড়ি শিল্প পর্যন্ত পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত অনেকগুলো খাত বিপাকে পড়ে যায়।
আনাদোলু এজেন্সির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুসারে, ভূরাজনৈতিক বিরোধ ও বাণিজ্য বিবাদে সুবিধা পেতে গোটা বিশ্বেই এখন বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে রফতানি নিয়ন্ত্রণ। বিশেষ করে শীর্ষ অর্থনীতিগুলো এখন তাদের কৌশলগত প্রযুক্তি, উপকরণ ও পরিষেবা যাতে সীমান্ত অতিক্রম করতে না পারে সে বিষয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্কতা অবলম্বন করছে। এসব দেশের কৌশলগত ও নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে সাম্প্রতিক মাসগুলোয় সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) উপকরণ, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং সিস্টেম ও সামরিক মানের উপকরণ রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রবণতা বেড়েছে। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে দেশীয় শিল্পে অগ্রাধিকার ও জাতীয় নিরাপত্তাঝুঁকির কথা, যা এক পর্যায়ে ভূরাজনৈতিক দরকষাকষির অস্ত্রে পরিণত হচ্ছে। প্রযুক্তি হস্তান্তর রোধ ও বাণিজ্য যুদ্ধের কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে রফতানি নিয়ন্ত্রণকে কাজে লাগাচ্ছে পরাশক্তিগুলো।
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মিনার্ভা টেকনোলজি ফিউচারসের কৌশল প্রধান এমিলি বেনসন বলেন, ‘গত কয়েক বছরই রফতানি নিয়ন্ত্রণ আক্রমণাত্মক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। যার উদ্দেশ্য কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বীদের সামরিক আধুনিকায়নের সক্ষমতা নষ্ট করা।’
তিনি আরো জানান, এ প্রক্রিয়ায় নতুন যা ঘটছে তা হলো—রফতানি নিয়ন্ত্রণ এখন সরাসরি বাণিজ্য আলোচনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে।
এর সর্বশেষ উদাহরণ হলো চীন-মার্কিন উত্তেজনা। গত ২ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের ওপর ব্যাপক রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ আরোপের ঘোষণা দেন। এর প্রতিক্রিয়ায় দুষ্প্রাপ্য খনিজ ও সংশ্লিষ্ট ম্যাগনেটের রফতানি স্থগিত করে বেইজিং, যা রাতারাতি ইউরোপীয় গাড়ি শিল্পের সরবরাহ চেইনে মারাত্মক ঘাটতির সৃষ্টি করে।
একাধিক পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বের দুষ্প্রাপ্য খনিজ উত্তোলনের প্রায় ৭০ শতাংশ ও পরিশোধনের ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে চীন। যদিও এ ধরনের খনিজের মজুদের মাত্র ৩৪ শতাংশ দেশটির সীমানার মধ্যে রয়েছে।
উত্তোলন ও পরিশোধন খাতের এ আধিপত্য এখন কৌশলগত সুবিধা আকারে ব্যবহার করছে চীন। বিকল্প সরবরাহ চেইন তৈরি না হলে সামনের দিনগুলোয় এ খাতে চীনের নিয়ন্ত্রণ আরো বাড়বে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (আইইএ) প্রতিবেদন অনুসারে, ২০৪০ সালের মধ্যে দুষ্প্রাপ্য খনিজের চাহিদা ৫০-৬০ শতাংশ বাড়তে পারে।
রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ প্রসঙ্গে শুরু থেকে চীনের সঙ্গে এক ধরনের মারমুখী অবস্থান বজায় রেখেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু বেইজিং দুষ্প্রাপ্য খনিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ শক্ত করার পরিপ্রেক্ষিতে ১১ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এ বিষয়ে একটি অস্থায়ী চুক্তি হয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ চুক্তি সাময়িকভাবে স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণপ্রাপ্তি নিয়ে উদ্বেগ নিরসন করতে পারেনি।
এদিকে চীনের দুষ্প্রাপ্য খনিজের ওপর নির্ভরতা কমাতে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করছে জাপান। ২০১০ সালে এক কূটনৈতিক বিরোধের জেরে দেশটিতে দুষ্প্রাপ্য খনিজ রফতানি স্থগিত করে বেইজিং। এরপর জাপান অর্গানাইজেশন ফর মেটালস অ্যান্ড এনার্জি সিকিউরিটির (জেওজিএমইসি) নামের উদ্যোগের মাধ্যমে বহুমুখী কৌশল গ্রহণ করে টোকিও। যার আওতায় শতাধিক বিদেশী প্রকল্পে ৬০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হয়।
২০১১ সালে অস্ট্রেলীয় কোম্পানি লাইন্যাস রেয়ার আর্থসের সঙ্গে জেওজিএমইসির অংশীদারত্ব গড়ে ওঠে, যা চীনের বাইরে বিশ্বের বৃহত্তম দুষ্প্রাপ্য খনিজ উত্তোলনকারী এবং বর্তমানে জাপানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আমদানির উৎস।
এছাড়া ইলেকট্রনিক বর্জ্য থেকে দুষ্প্রাপ্য খনিজ আহরণে ‘আরবান মাইনিং’ কৌশলেও ঝুঁকেছে জাপান এবং মূল কাঁচামালের ১৮০ দিনের মজুদ গড়ার লক্ষ্য নিয়েছে। টোকিও ২০২৮ সালের মধ্যে গভীর সমুদ্রভিত্তিক খনিতে ১৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনাও করছে।
দুষ্প্রাপ্য খনিজের সরবরাহ চেইন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি উদ্ভাবনেও অগ্রণী ভূমিকা নিচ্ছে জাপান। দেশটির অটো খাতের বড় কোম্পানি হোন্ডা এমন নিওডিমিয়াম ম্যাগনেট তৈরি করেছে, যা ভারী দুষ্প্রাপ্য খনিজ ছাড়াই হাইব্রিড গাড়িতে ব্যবহার করা যায়। পেরোভস্কাইট সৌরকোষে ১৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে জাপান, এটি প্রচলিত সিলিকন প্যানেলের বিকল্প হিসেবে কাজ করবে। এমন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন চলছে, যাতে ২০৪০ সাল নাগাদ এসব প্রকল্পের উৎপাদন সক্ষমতা ২০টি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সমতুল্য হয়।
রফতানি নিয়ন্ত্রণ শুধু উদ্ভাবনেই উৎসাহিত করছে না, একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী ব্যবসা কৌশলে পরিবর্তন আনছে। এমিলি বেনসন বলেন, ‘কোম্পানিগুলোকে ক্রমাগত পরিবর্তনশীল বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে। এটি এখন এমন একটি কৌশলগত হাতিয়ার, যার মাধ্যমে অন্যান্য ক্ষেত্রে ছাড় আদায়ের চেষ্টা চলছে।’
ভিয়েনা ইউনিভার্সিটি অব ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেসের ভিজিটিং স্কলার মেহমেত আলপারতুনগা আফসি বলেন, ‘যেসব দেশ দুষ্প্রাপ্য খনিজ প্রক্রিয়াকরণের সক্ষমতা রাখে, তারা দিন দিন আরো কৌশলগত সুবিধা পাচ্ছে। এ অবস্থা পুরনো আমদানিনির্ভর প্রতিরক্ষামূলক নীতিমালার ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।’
তিনি জানান, যেসব দেশ প্রযুক্তিগতভাবে অনুন্নত ও দুষ্প্রাপ্য খনিজ মজুদের দিক থেকে পিছিয়ে, তাদের উচিত এমন প্রযুক্তিতে মনোনিবেশ করা, যেখানে দুষ্প্রাপ্য খনিজের প্রয়োজন সবচেয়ে কম।